অচেনা পথে থ্রিলার-সফর। কেমন হল ‘কর্মা কোর্মা’? সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত


‘তোমার ঘরে বসত করে কয়জনা, মন জানোনা…’ সত্যিই তো। একটা মনের মধ্যিখানে কি একখানাই মানুষের বসত? নাকি একাধিক চরিত্রের মিলিজুলিতে বসত গড়ে মন? 

 

এই প্রশ্নটাকে ঘিরেই এক অচেনা স্বাদের থ্রিলার নিয়ে ওটিটি পর্দায় হাজির প্রতীম ডি গুপ্ত। হইচই-এর নতুন সিরিজ ‘কর্মা কোর্মা’ তাই ঘুরপাক খায় মনস্তত্ত্বের চোরা গলির আঁকেবাঁকে। চেনা মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা অচেনা মনগুলোকে টেনে বার করে আনতে চায়। পর্দা সরিয়ে, পেঁয়াজের খোসা উড়িয়ে বুঝতে চায়, খুঁজতে চায় জটিলতার হদিশ।

 

থ্রিলার কাহিনি। তাতে অপরাধ আছে। অপরাধের শিকড়ে পৌঁছতে, রহস্যভেদের টানে চোর-পুলিশ খেলা আছে। কিন্তু বাংলা ওটিটি দুনিয়ায় যে চিরচেনা ছকে হাঁটে থ্রিলার সিরিজ, তার থেকে এক্কেবারে অন্য পথ ধরেছেন প্রতীম। বরাবরই তাঁর কাজে থাকে অচেনা স্বাদ। ‘টুথ পরি’ কিংবা ‘মাছের ঝোল’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’ কিংবা ‘চালচিত্র’- গল্প বলার অন্য রকম ভঙ্গীতে জাত চিনিয়ে আসা পরিচালক এবারেও হতাশ করেননি। মনের গহীন চেনাতে কল্পদৃশ্যে ভর করে ‘কর্মা কোর্মা’তেও মন কেড়েছে তাঁর গল্প বলার ভঙ্গী। হু-ডান-ইট হয়েও এ সিরিজ তাই অনায়াসে মিলেমিশে গিয়েছে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের ঘরানায়।

 


নিম্নমধ্যবিত্ত দম্পতি গোপাল (প্রতীক দত্ত) আর ঝিনুকের (সোহিনী সরকার) জীবন ঘিরে থাকে রোজকার অশান্তি আর মদ্যপ, কর্মহীন স্বামীর হাতে স্ত্রীর মার খাওয়ার দিনলিপি। এমন এক সংসার থেকে বেরিয়ে সাউন্ড রেকর্ডিস্ট নীলের (কল্পন মিত্র) স্টুডিওয় প্রায়শই রাতভর ডাবিং আর্টিস্টের কাজ করে ঝিনুক। আর মনের মধ্যে জমিয়ে রাখে রান্নার শখ। নিজের জমানো টাকা দিয়ে একদিন তাই সে সাহস করে পৌঁছে যায় অওয়াধি কুকিং ওয়ার্কশপে। সেখানেই আলাপ বিত্তশালী পরিবারের গৃহবধূ সাহানার (ঋতাভরী চক্রবর্তী) সঙ্গে। অর্থনৈতিক অবস্থানে ঢের পিছিয়ে থাকা জড়োসড়ো ঝিনুকের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায় সাহানার। আর অবাক হয়ে ঝিনুক দেখে সমাজে বহুলপরিচিত, নামকরা ডাক্তার অর্জুন সেনের (শতাফ ফিগর) সুন্দরী স্ত্রী, বিলাসে-আভিজাত্যে মোড়া সাহানাও তারই মতো অসুখী। কারণ তার স্বামী একের পর এক মেয়ের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে। ওয়ার্কশপের শেষ দিনে ওয়াইনের নেশার ঘোরে তাই ঝিনুক বলে বসে একে অন্যের স্বামীকে খুন করে ফেলার কথা— ‘খেল খতম, হাজবেন্ড হজম’! নিরীহ, নির্বিবাদী, নির্বিচারে বরের হাতে মার খেয়েও প্রতিবাদ করতে না পারা ঝিনুকের পক্ষে স্বাভাবিক অবস্থায় যে কথাটা বলা কার্যত অসম্ভব ছিল। এর দিন কয়েকের মধ্যেই এক সকালে স্টুডিও থেকে বাড়ি ফিরে সে দেখে তার মাতাল স্বামী বারান্দা থেকে নীচে পড়ে মরে গিয়েছে। ভয়ে কাঁটা ঝিনুক ধরে নেয়, এ কাজ সাহানারই। এবার কি তবে তার কথা রাখার পালা? সে ভাবনাটাই তাকে তাড়া করে বেড়াতে থাকে। সঙ্গে সাহানাও। আভিজাত্য-বিলাসের মখমলি দুনিয়ার বাসিন্দার সেই ধূসর, কঠিন চেহারাটাও যে ঝিনুকের বড্ড অচেনা। 

 


এদিকে তার পিছনে ছিনে জোঁকের মতো লেগে থাকে স্থানীয় মুচিপুকুর থানার ছাপোষা তবে তুখোড় বুদ্ধিধর ওসি ভূপেন (ঋত্বিক চক্রবর্তী) এবং তার শাগরেদ কানাই (দুর্বার শর্মা)। কিন্তু সত্যিই কি সাহানা-ই খুন করল গোপালকে? প্রতিদানে ঝিনুকও কি খুন করবে অর্জুনকে? নাকি অপরাধের জাল বিছানো আছে আরও গভীরে? কার কর্মফলে কী ঘটবে শেষমেশ? রহস্যের সঙ্গে রান্নাবাটির মিশেলে তারই গল্প বলেছে এ সিরিজ। সত্যি খোঁজার তাড়ায় দর্শককে না ছুটিয়ে ঢিমেতালে, নিভু আঁচে জম্পেশ করে কষিয়েছে মশলাপাতি। থ্রিলার-প্রেমী দর্শকও তাই একেক বার একেক রকম ক্লাইম্যাক্স অনুমান করে গিয়েছেন শুরু থেকে শেষ।  

 

 

বরাবরের মতোই দুরন্ত ঋত্বিক চক্রবর্তী। অ্যাসিডিটিতে ভোগা পেটরোগা বাঙালির মধ্যে যথারীতি তিনি অবলীলায় বুনে দেন কৌতূহল, রসবোধ আর বুদ্ধিমত্তার ঝলকানি। হতাশা-অবসাদে মোড়া জীবনযাপন থেকে ভয়ে কুঁকড়ে থাকা ঝিনুককে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন সোহিনীও। যদিও কোথাও কোথাও একটু যেন নিষ্প্রভ লাগে তাঁকে। এ সিরিজের চমক ঋতাভরী। এ পর্যন্ত পর্দার গুডগার্ল ধূসর চরিত্রেও এমন জীবন্ত হয়ে উঠবেন কে জানত! ঋত্বিকের পাশে নিখুঁত কমিক টাইমিংয়ে দারুণ লাগে দুর্বারকেও। পুরুষতন্ত্রে আপাদমস্তক ডুবে থাকা, মদ্যপ গোপাল হিসেবে প্রতীকও বেশ ভাল। 

 

 

তবে অচেনা পথে হাঁটার এক্সপেরিমেন্টে কোথাও কোথাও কল্পদৃশ্যের অবতারণা প্রয়োজনের তুলনায় একটু যেন বাড়তি মনে হয়। যে কারণে সাত পর্বের কাহিনিতে প্রথমদিকে খানিকটা ধাক্কা খায় গল্পের গতি। কখনও কখনও গুলিয়ে যায় কোনটা সত্যি, কোনটা কল্পনা। সিরিজে গল্প বা তার চরিত্রদের মুড অনুযায়ী পাল্টে যায় রঙের ব্যবহার, আলোআঁধারি। সেটা বেশ লাগে। তবে একরাশ আলোর মধ্যে সাহানা কেন সানগ্লাস পরে ঘোরেন, সেটা বোঝা গেলনা ঠিক। তাছাড়া, রান্নার সঙ্গে রহস্যকে মেশাতে গিয়ে একেকটা পর্বের নাম খাবারের নামে রাখা হলেও প্রতিটা নামকরণের তাৎপর্যগুলো একটু বোঝা গেলে মন্দ হত না।  

 

বাকিটুকুতে রেসিপি জমেছিল ভালই। তবু শেষপাতের ট্যুইস্টটায় প্রতীমের থেকে আরও খানিকটা চমক প্রত্যাশিত ছিল। এই আর কী!