আজকাল ওয়েবডেস্ক: গুজরাট সরকার রাজ্যকে অপুষ্টিমুক্ত করার লক্ষ্যে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিলেও সংসদে সম্প্রতি পেশ হওয়া তথ্য সেই দাবির সঙ্গে কোনও মিল পাওয়া যায়নি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গুজরাটে পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩.২১ লক্ষ শিশু বর্তমানে অপুষ্টিতে ভুগছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই শিশুদের একটি বড় অংশের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ইতিমধ্যেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব তাদের সারাজীবন বহন করতে হতে পারে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং বুদ্ধির বিকাশে স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়ে শিক্ষাক্ষেত্রে ও শ্রম উৎপাদনশীলতায়, যা কেবল ব্যক্তি নয়, গোটা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোকেও দুর্বল করে তোলে।

এই পরিস্থিতি সবচেয়ে প্রকট গুজরাটের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে। বহু আদিবাসী গ্রামে আজও শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব স্পষ্ট। রাজ্যের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক দক্ষতার যে চিত্র প্রচার করা হয়, সংসদে প্রকাশিত তথ্য সেই বয়ানের সঙ্গে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করেছে। উন্নয়নের স্লোগান বাস্তবে আদিবাসী মহিলা  ও শিশুদের জীবনে প্রতিফলিত হচ্ছে না বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

উল্লেখযোগ্য যে, গুজরাটে মাতৃ ও শিশু পুষ্টি নিশ্চিত করতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের একাধিক প্রকল্প চালু রয়েছে। জননী সুরক্ষা যোজনা, কস্তুরবা পোষণ সহায় যোজনা, প্রধানমন্ত্রী মাতৃ সুরক্ষা অভিযান, প্রধানমন্ত্রী মাতৃবন্দনা যোজনা এবং অপুষ্টিমুক্ত গুজরাট অভিযান, এই প্রকল্পগুলির লক্ষ্য ছিল গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এবং শিশুদের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বহু এলাকায় আঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলি পরিকাঠামো ও জনবলের ঘাটতিতে ভুগছে, পুষ্টিকর খাদ্যের সরবরাহ অনিয়মিত এবং নজরদারি ব্যবস্থাও দুর্বল, বিশেষত দুর্গম আদিবাসী অঞ্চলে।

অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পগুলির বাস্তবায়ন শেষ পর্যায়ে ভেঙে পড়ছে। ফলে যাঁদের জন্য এই প্রকল্পগুলি, সেই আদিবাসী মহিলা  ও শিশুরাই ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়ছেন। বিরোধী শিবির প্রশ্ন তুলেছে, বছরের পর বছর ধরে অর্থ বরাদ্দ চললেও কেন অপুষ্টির সূচকে তেমন কোনও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

গুজরাট কংগ্রেসের মুখপাত্র মনীশ দোশী অভিযোগ করেছেন, বহু কল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবে সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছানোর আগেই দুর্নীতির কবলে পড়ছে। ভাইবস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, প্রকল্পগুলি যদি আন্তরিকভাবে ও যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হতো, তবে অপুষ্টির মতো সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব ছিল। তাঁর মতে, সমাজে মায়েদের পুষ্টির প্রয়োজনকে দীর্ঘদিন অবহেলা করার ফলেই শিশুরাও অপুষ্টির শিকার হচ্ছে।

পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে আদিবাসী মহিলাদের  মধ্যে রক্তাল্পতার ব্যাপকতা। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্য অনুযায়ী, গুজরাটে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী আদিবাসী মহিলাদের  ৭৮ শতাংশই অ্যানিমিয়ায় আক্রান্ত। চিকিৎসকদের মতে, রক্তাল্পতা মহিলাদের  রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে, গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি বাড়ায় এবং কম ওজনের শিশুর জন্মের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে, যার ফলে অপুষ্টির চক্র প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে।

যদিও ‘অ্যানিমিয়া মুক্ত ভারত’, নিউট্রিশন রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম এবং একাধিক মাতৃস্বাস্থ্য প্রকল্প সরকারি নথিতে সক্রিয় বলে দাবি করা হয়, বাস্তবে আদিবাসী অঞ্চলে স্বাস্থ্য পরিষেবার সীমিত উপস্থিতি ও সচেতনতার অভাবে এই কর্মসূচিগুলির কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল পরিকাঠামো উন্নয়ন বা অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে উন্নয়নকে মাপা যায় না। সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে যদি মৌলিক পুষ্টি ও স্বাস্থ্য পরিষেবা না পৌঁছায়, তবে উন্নয়নের সাফল্যের দাবি অর্থহীন হয়ে পড়ে। স্বচ্ছ প্রশাসন, কঠোর জবাবদিহি এবং কার্যকর পরিষেবা ছাড়া গুজরাটে অপুষ্টিমুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হবে না বলেই মত তাঁদের।