আজকাল ওয়েবডেস্ক: একটি সাম্প্রতিক বিস্তৃত গবেষণা রিপোর্টে বিনোদন জগতকে কার্যত চমকে দিয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য- ক্রাইম ও ট্রু ক্রাইম ঘরানার সিরিজ, সিনেমা, ডকুমেন্টারি ও পডকাস্টের দর্শকদের প্রায় ৮০ শতাংশই মহিলা। এতদিন ধরে এই ধরনের কনটেন্টকে পুরুষ-প্রধান দর্শকনির্ভর বলে মনে করা হলেও, এই সমীক্ষা সেই প্রচলিত ধারণাকে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, টেলিভিশন চ্যানেল এবং অনলাইন স্ট্রিমিং পরিষেবার দর্শকদের উপর এই সমীক্ষা চালানো হয়। বিভিন্ন বয়স, পেশা ও সামাজিক পটভূমির হাজার হাজার মানুষের মতামত বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। গবেষণা প্রকাশের পর থেকেই বিনোদন মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে কেন ক্রাইম কনটেন্টে এত বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন মহিলা দর্শকেরা?
গবেষণায় উঠে এসেছে, আধুনিক ক্রাইম সিরিজ বা ট্রু ক্রাইম কনটেন্ট আর শুধু রক্তপাত বা হিংসার উপর দাঁড়িয়ে নেই। বরং অপরাধের নেপথ্যের কারণ, অপরাধীর মানসিক গঠন, ভিকটিম কীভাবে ফাঁদে পড়লেন, তদন্তের জটিলতা এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায়বিচার পাওয়ার লড়াই-এই সব দিক গভীরভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। এই বাস্তবধর্মী ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই মহিলা দর্শকদের বেশি আকর্ষণ করছে।
গবেষকদের মতে, মহিলারা অপরাধের ভয় থাকা সত্ত্বেও এই ঘরানার কনটেন্টে আগ্রহী হন, কারণ এর মাধ্যমে তাঁরা বুঝতে চান অপরাধ কীভাবে সংঘটিত হয়, আক্রমণকারীর ট্রিগার কী, ভিকটিম কোথায় ভুল করেছিলেন বা কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, এই কনটেন্ট দেখার সময় মহিলারা অবচেতনভাবে ভয়ংকর পরিস্থিতি মোকাবিলার কৌশল ও বিপদের পূর্বাভাস চিনতে শেখেন।
সমীক্ষায় আরও দেখা গেছে, ট্রু ক্রাইম কনটেন্ট দেখার ফলে অনেক মহিলার দৈনন্দিন আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। দরজার তালা বারবার পরীক্ষা করা, পেপার স্প্রে বা মেস সঙ্গে রাখা- এই ধরনের সতর্কতা আগের তুলনায় বেড়েছে। গবেষকদের মতে, অনেক সময় মহিলারা নিজেরাই বুঝতে পারেন না যে আত্মরক্ষার এই চাহিদাই তাঁদের ক্রাইম কনটেন্টের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে, গবেষক গান্ধী বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁর মতে, বাস্তব জীবনে মহিলারা অনেক সময় অপরাধের শিকার বা সারভাইভার হন, অপরাধী হন খুব কম ক্ষেত্রেই। তাই ক্রাইম গল্পের প্রতি তাঁদের আকর্ষণের পেছনে রয়েছে এক ধরনের ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা।
গান্ধীর ভাষায়, “একটি গভীরভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করার ফলে মহিলাদের কাছে নিরাপত্তাহীনতা ও ভয় প্রায় স্থায়ী অনুভূতি। ট্রু ক্রাইম গল্পে যখন শেষ পর্যন্ত বিচার হয়, অপরাধী শাস্তি পায়, তখন সেই ন্যায়ের অনুভূতিই হয়তো আমাদের মানসিক স্বস্তি দেয়। এটি এমন এক কল্পিত জগৎ, যেখানে আইন ও সামাজিক ব্যবস্থা মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।”
তবে গান্ধী এটাও মনে করেন, এই কনটেন্ট বাস্তব জীবনের কাঠামো খুব একটা বদলায় না। তাঁর মতে, এটি মূলত এক ধরনের ‘মানসিক মুক্তির জায়গা’, যেখানে দর্শক সাময়িক স্বস্তি খুঁজে পান।
গবেষণায় পুরুষ ও মহিলাদের প্রতিক্রিয়া তুলনা করে দেখা গেছে, ভয়েই আতঙ্কিত হলেও, মহিলাদের উদ্বেগের মাত্রা তুলনামূলক বেশি। তবুও আশ্চর্যের বিষয়, এই অস্বস্তি তাঁদের সিরিজ দেখা বা শোনা বন্ধ করতে পারে না। ‘এরপর কী হবে’ এই কৌতূহল এবং ঘটনার নানা ইঙ্গিত খুঁজে বের করার প্রবণতা ভয়কে ছাপিয়ে যায়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, মহিলারা তাঁদের ‘ট্রু ক্রাইম ফিক্স’-এর জন্য নির্ঘুম রাত কাটাতেও প্রস্তুত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ছোটবেলায় আগুনের চারপাশে বসে ভৌতিক গল্প বলার যে রোমাঞ্চ ছিল, আজ তা বদলে গেছে প্রযুক্তির মাধ্যমে। সেই ‘এরপর কী হবে’ উত্তেজনা আজ পাওয়া যায় ট্রু ক্রাইম সিরিজ, ডকুমেন্টারি ও পডকাস্টে।
‘মিশিগান মার্ডার্স’, ‘দ্য কিপার্স’-এর মতো ডকুমেন্টারি সিরিজ বা স্পটিফাইয়ের ‘কেসফাইল’, ‘সিরিয়াল কিলার্স’ পডকাস্ট বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গবেষণার দাবি, এই কনটেন্ট একবার শুরু করলে সবচেয়ে বেশি ‘সুইচ অফ’ করতে পারেন না মহিলারাই।
সব মিলিয়ে, এই গবেষণা বিনোদন শিল্পের জন্য স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে ক্রাইম কনটেন্টের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন মহিলা দর্শক। তাঁরা কেবল সংখ্যায় বেশি নন, তাঁদের মানসিকতা, নিরাপত্তা-বোধ ও ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষাই ভবিষ্যতের ক্রাইম গল্প বলার ধরন নির্ধারণ করবে।
