আজকাল ওয়েবডেস্ক: চীনের জনসংখ্যা সংকট আরও গভীর হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে টানা চতুর্থ বছরের মতো দেশটির মোট জনসংখ্যা কমেছে। সোমবার প্রকাশিত পরিসংখ্যানে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে চীনের মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪০ কোটি ৪০ লাখ, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ লাখ কম। এই সংখ্যা শুধু একটি বার্ষিক হ্রাস নয়, বরং চীনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যার সঙ্কটের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে জন্মসংখ্যা ও জন্মহারের পরিসংখ্যানে। ২০২৫ সালে চীনে জন্মেছে মাত্র ৭৯ লাখ ২০ হাজার শিশু, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬ লাখ ২০ হাজার কম যা প্রায় ১৭ শতাংশ পতন। ২০২৪ সালে জন্মসংখ্যায় যে সামান্য বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল, তা যে স্থায়ী কোনও লক্ষণ ছিল না, তা এবার পরিষ্কার হয়ে গেল। এর আগে ২০১৭ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত টানা সাত বছর জন্মসংখ্যা ক্রমাগত কমেছিল। জন্মহারের হিসাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ২০২৫ সালে জন্মহার নেমে এসেছে প্রতি হাজারে মাত্র ৫.৬৩ জনে, যা চীনের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।
এই পতন ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন চীন এক দশকেরও বেশি আগে তার কঠোর এক-সন্তান নীতি থেকে সরে এসেছে। ২০১৫ সালে দুই সন্তানের অনুমতি এবং ২০২১ সালে তিন সন্তানের নীতি চালু করা হয়েছিল মূলত দ্রুত বার্ধক্যজনিত সমাজ, কমতে থাকা শ্রমশক্তি এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার জন্য। কিন্তু নীতিগত নমনীয়তা বাস্তবে প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। বহু পরিবারই একাধিক সন্তান নিতে অনাগ্রহী রয়ে গেছে।
পরিবারগুলোর এই অনীহার পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। সন্তান বড় করার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, শিক্ষা ব্যবস্থায় তীব্র প্রতিযোগিতা, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দা, সব মিলিয়ে তরুণ দম্পতিদের ওপর চাপ বেড়েছে বহুগুণ। অনেকের কাছেই সন্তান নেওয়া এখন আর ব্যক্তিগত আনন্দের বিষয় নয়, বরং আর্থিক ও মানসিক ঝুঁকির সমার্থক।
সরকার জন্মহার বাড়াতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে ঘোষণা করা হয়েছে, প্রতি সন্তানের জন্য পরিবারগুলোকে ৩,৬০০ ইউয়ান করে নগদ ভর্তুকি দেওয়া হবে। পাশাপাশি, কিন্ডারগার্টেন, ডে-কেয়ার পরিষেবা এবং এমনকি ম্যাচমেকিং পরিষেবাকেও করছাড়ের আওতায় আনা হয়েছে, যাতে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তবে একই সঙ্গে বিতর্ক তৈরি হয়েছে গর্ভনিরোধক সামগ্রী নিয়ে। ২০২৫ সাল থেকে কন্ডোম এবং বিভিন্ন গর্ভনিরোধক পণ্যকে ভ্যাট-মুক্ত তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ১৩ শতাংশ কর আরোপ করা হয়েছে, যা অনেকের মতে নীতিগতভাবে পরস্পরবিরোধী সংকেত দিচ্ছে।
চীন নিয়মিতভাবে মোট উর্বরতা হার প্রকাশ করে না। সরকার সর্বশেষ ২০২০ সালে এই হার ১.৩ বলে জানিয়েছিল। কিন্তু জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমানে এটি সম্ভবত ১-এর কাছাকাছি বা তারও নিচে নেমে গেছে, যেখানে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন ২.১। এই বাস্তবতা চীনের ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার ও সামাজিক কাঠামোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।
এই জনমিতিক পরিবর্তনের প্রভাব ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২৩ সালে চীন বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের স্থান হারিয়ে ভারতের পিছনে চলে যায়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং চীনের অর্থনৈতিক গতি, ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে, নীতির পরিবর্তন ও আর্থিক সুবিধা সত্ত্বেও চীনের জনসংখ্যা হ্রাস থামছে না। রাষ্ট্রের পরিকল্পনা ও সাধারণ মানুষের জীবনের বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান যতদিন কমবে না, ততদিন এই জনসংখ্যা সংকট চীনের জন্য এক নীরব কিন্তু গভীর সংকট হিসেবেই থেকে যাবে।
