আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) নিয়ে নির্বাচন কমিশনের গতিবেগ যেন রাজধানী এক্সপ্রেস থেকেও বেশি দ্রুতগামী। বলাবাহুল্য রাজধানী এক্সপ্রেস কেউ পেছনে ফেলে উর্ধ্বশ্বাসে এগিয়ে চলেছে 'এসআইআর'। নির্বাচন কমিশন চাইছে অতি শীঘ্রই দ্রুততার সাথে নির্ভুলভাবে এই প্রক্রিয়া শেষ করতে এবং শুনানি পর্ব এই ৩০ দিনের মধ্যেই সম্পন্ন করতে। উঠছে প্রশ্ন, নির্ভুলভাবে সত্যি কি সম্ভব? যদিও রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তর এখনো স্পষ্ট করে জানাতে পারেনি যে তারা ৩০ দিনের মধ্যেই হিয়ারিং অর্থাৎ শুনানি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবে কিনা।
এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তর জানিয়েছে, তারা যে করেই হোক এই ৩০ দিনের মধ্যেই তাদের এই কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করবে। এ জায়গায় প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি নির্বাচন কমিশন দ্রুততার সাথে যেন তেন প্রকারেই ঠিক ভুল না বিচার করেই 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চাইছে? যা নিয়ে একাধিকবার সরব হয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশন যে কথা বারবার বলেছেন যে, একটিও ন্যায্য ভোটারের নাম বাদ যাবে না, সত্যিই কি তা সম্ভব হবে এত দ্রুত তার সাথে শুনানি পর্ব সম্পন্ন করলে? কারণ খসড়া তালিকা প্রকাশের পর শুনানি পর্ব শুরুর আগেই একাধিক প্রশ্ন উঠেছে বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম নিয়ে। প্রকাশ্যে এসেছে একদিকে যেমন বিএলও আধিকারিকদের দ্রুততার সাথে কাজ করার জন্য একাধিক গাফিলতির চিত্র এবং অভিযোগ তাদের ঠিকমত প্রশিক্ষণ না করানোর কারনেও একাধিক ভুলভ্রান্তির কারণ। এছাড়াও AI পরিচালিত অ্যাপ ব্যবহার করে ভুল সংশোধন করতে গিয়ে একাধিক বিরম্বনার মুখে পড়তে হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে, এমনটাই নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর।
উল্লেখ্য, রাজ্যের বেশিরভাগ জেলাগুলিতেই বহু ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে যারা ২০০২ এর ভোটার কিংবা জীবিতবস্থায় মৃত পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে শাসক দল তৃণমূল। যা নিয়ে একাধিক ঘটনার সাক্ষী থেকেছে বাংলার সাধারণ মানুষ। আর সেই অভিযোগ নিয়েই মঙ্গলবার রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তরে অভিযোগের পাহাড় নিয়ে এদিন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তরে হাজির হন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ পার্থ ভৌমিক, রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য সহ একাধিক নেতা-কর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় জীবিত ভোটারদের মৃত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, আবার বহু মৃত ভোটারের নাম এখনও তালিকায় বহাল রয়েছে। চণ্ডীতলার কাউন্সিলর সূর্য দে-কে জীবিত অবস্থায় মৃত দেখানো হয়েছে বলে পর্যন্ত অভিযোগ। যার কারণে শোকজ নোটিশ পর্যন্ত করেছে নির্বাচন কমিশন নিজে এই অঞ্চলের বিএলও আধিকারিককে। নৈহাটি বিধানসভা এলাকায় একাধিক ভোটারের নাম অকারণে বাদ পড়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
এই সব অভিযোগ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে এবং ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে।
এদিকে, ভিন রাজ্য থেকে মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগের জবাবে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক স্পষ্ট করেন, মাইক্রো অবজারভার হিসেবে যাঁদের নিয়োগ করা হচ্ছে, তাঁরা কোন রাজ্যের তা বিবেচ্য নয়। তাঁরা সরকারি কর্মী এবং সেই পরিচয়েই তাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে আধিকারিকদের রাজ্য পরিচয় কোনও বিষয় নয় বলেই জানানো হয়েছে।
বলাবাহুল্য, নতুন ভোটারের নাম তোলা, মৃত ভোটারের নাম বাতিল ও ভুল সংশোধন সংক্রান্ত অভিযোগে যেসব আবেদন জমা পড়েছে, সেগুলির শুনানির প্রস্তুতি শুরু করল নির্বাচন কমিশন। আজ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তর শুনানি পর্ব নিয়ে জানিয়েছেন, ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ফর্মে জমা পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে শুনানির জন্য আলাদা তালিকা প্রকাশ করবেন বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলও)।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, এই তালিকা সংশ্লিষ্ট বুথ কেন্দ্র ও এলাকায় টাঙিয়ে দেওয়া হবে। শুনানি শেষে যাচাই করা নামগুলি ৯, ১০ ও ১১ নম্বর তালিকা অনুযায়ী চূড়ান্ত করে প্রকাশ করবেন বিএলও আধিকারিকরা।
ভোট প্রক্রিয়া ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত মিলছে দিল্লির বৈঠক থেকে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, আগামী ৫ জানুয়ারি দিল্লিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হতে চলেছে, যেখানে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল, জাতীয় নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্তারা ও একাধিক আধিকারিকরা। বৈঠকে মূলত পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
অন্যদিকে, একই দিনে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে পৌঁছান বিজেপি নেতা তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিশিথ প্রামানিক। তিনি অভিযোগ করেন, এখনও পর্যন্ত যে পরিমাণ নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা অত্যন্ত কম। তাঁর দাবি, রাজ্যে আরও বহু ভুয়া ভোটার রয়েছেন, যাঁদের নাম এখনও বাদ যায়নি। এই বিষয়ে কড়া পদক্ষেপের দাবি জানিয়ে তিনি নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
বলাবাহুল্য, ভোটার তালিকা সংশোধনকে ঘিরে শাসক ও বিরোধী—দু’পক্ষের চাপের মুখে নির্বাচন কমিশন। তদন্ত, শুনানি ও দিল্লির বৈঠকের পর কমিশনের পরবর্তী সিদ্ধান্তই এখন নজরে রাজ্যবাসীর।
