আজকাল ওয়েবডেস্ক: লিবিয়ার প্রাক্তন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির সবচেয়ে পরিচিত ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় পুত্র সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি আর বেঁচে নেই। সৌদি মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়া-র খবরে দাবি করা হয়েছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে পশ্চিম লিবিয়ার জিনতান শহরে নিজ বাসভবনে সশস্ত্র হামলায় ৫৩ বছর বয়সি সাইফ আল-ইসলামকে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাজধানী ত্রিপোলি থেকে প্রায় ১৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত এই পাহাড়ি শহরটি দীর্ঘদিন ধরেই গাদ্দাফি-পুত্রের আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।
পরিবারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের মাধ্যমে আল আরাবিয়া জানায়, চারজন হামলাকারী সাইফ আল-ইসলামের বাড়ির নিরাপত্তা ক্যামেরা অচল করে দেয়। এরপর বাড়ির বাগানে তাঁর সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে ঘটনাটি ঘটে। হামলার পরপরই আততায়ীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পূর্ণ বিবরণ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি, তবে সাইফ আল-ইসলামের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী একে স্পষ্টভাবে “রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড” বা assassination বলে বর্ণনা করেছেন।
সাইফ আল-ইসলামের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং ২০২০–২১ সালে তাঁর রাজনৈতিক দলের সদস্য আবদুল্লাহ ওসমান ফেসবুকে একটি পোস্টে মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। সেখানে তিনি লেখেন, “আমরা আল্লাহর এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাই। মুজাহিদ সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফি এখন সৃষ্টিকর্তার কাছে চলে গেছেন।”
&t=2sসাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির জীবন ছিল নাটকীয় উত্থান-পতনে ভরা। এক সময় তাঁকেই মনে করা হতো মুয়াম্মার গাদ্দাফির সম্ভাব্য উত্তরসূরি—একজন ‘সংস্কারপন্থী’ মুখ, যিনি লিবিয়াকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গ্রহণযোগ্য করে তুলবেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সে পড়াশোনা করা, সাবলীল ইংরেজিভাষী সাইফ আল-ইসলাম পশ্চিমী বিশ্বের সঙ্গে লিবিয়ার সম্পর্ক ভাল করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই লিবিয়া গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচি পরিত্যাগের আলোচনা চালায় এবং ১৯৮৮ সালের লকারবি বিমান বিস্ফোরণে নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়।
মানবাধিকার, সংবিধান প্রণয়ন এবং রাজনৈতিক সংস্কারের কথা বলে তিনি একসময় পশ্চিমী কূটনীতিকদের কাছে ‘গ্রহণযোগ্য গাদ্দাফি’ হিসেবে পরিচিতি পান। কিন্তু ২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ লিবিয়ায় আছড়ে পড়লে সেই ভাবমূর্তি দ্রুত ভেঙে যায়।
গাদ্দাফি-বিরোধী বিদ্রোহ শুরু হলে সাইফ আল-ইসলাম পরিবার ও গোত্রের প্রতি আনুগত্য বেছে নেন। তিনি বিদ্রোহীদের ‘ইঁদুর’ বলে আখ্যা দেন এবং কঠোর দমননীতির অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন। সে সময় রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “আমরা এখানেই লড়ব, এখানেই মরব।”
কিন্তু বিদ্রোহীরা ত্রিপোলি দখল করার পর তাঁর পক্ষে আর পালানোর পথ খোলা ছিল না। ছদ্মবেশে প্রতিবেশী নাইজারে পালানোর চেষ্টা করার সময় জিনতান-ভিত্তিক আবু বকর সাদিক ব্রিগেড তাঁকে মরুভূমির রাস্তায় আটক করে। তাঁর পিতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি বিদ্রোহীদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হওয়ার প্রায় এক মাস পর তাঁকে জিনতানে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরবর্তী ছয় বছর সাইফ আল-ইসলাম কাটান জিনতানের বন্দিদশায়—একসময়ের বিলাসবহুল জীবন থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত বাস্তবতায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিনিধিরা তাঁর সঙ্গে দেখা করলে তিনি জানান, তিনি বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন, কথা বলার পেতেন না। তখন তাঁর একটি দাঁত ভাঙা ছিল।
২০১৫ সালে ত্রিপোলির একটি আদালত তাঁকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গুলি করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। যদিও জিনতানের মিলিশিয়া ২০১৭ সালে একটি সাধারণ ক্ষমা আইনের আওতায় তাঁকে মুক্তি দেয়, তবুও হত্যার আশঙ্কায় তাঁকে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে হয়।
২০২১ সালে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক মঞ্চে ফিরে আসেন সাইফ আল-ইসলাম। ঐতিহ্যবাহী লিবীয় পোশাক ও পাগড়ি পরে দক্ষিণের শহর সাবহায় তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনোনয়ন জমা দেন। ২০১১ সালের পরের বিশৃঙ্খলা ও হিংসায় ক্লান্ত একাংশ জনগণের মধ্যে তিনি গাদ্দাফি-যুগের আপাত স্থিতিশীলতার নস্টালজিয়াকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তাঁর প্রার্থিতা তীব্র বিতর্কের জন্ম দেয়। গাদ্দাফি শাসনের নিপীড়নের শিকার মানুষজন এবং ২০১১ সালের বিদ্রোহ থেকে উঠে আসা শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি তাঁর প্রত্যাবর্তন মানতে নারাজ ছিল। ২০১৫ সালের সাজাকে সামনে রেখে তাঁকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে গেলে আদালতের সামনে সশস্ত্র যোদ্ধারা পথ অবরোধ করে। এই টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই ভেঙে দেয়, আর লিবিয়া ফের রাজনৈতিক অচলাবস্থায় ফিরে যায়।
সাইফ আল-ইসলাম গাদ্দাফির মৃত্যু শুধু একজন ব্যক্তির হত্যাই নয়, বরং লিবিয়ার এক অসমাপ্ত ও বিতর্কিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের রক্তাক্ত সমাপ্তি। গাদ্দাফি-উত্তর লিবিয়ায় যেখানে রাষ্ট্র এখনো বিভক্ত, সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব প্রবল এবং রাজনৈতিক সমঝোতা অধরা—সেখানে এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে অস্থিরতা ও প্রতিশোধের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
এই মৃত্যুই কি গাদ্দাফি পরিবারের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের শেষ অধ্যায়, নাকি এটি লিবিয়ার দীর্ঘ সংকটের আরও একটি হিংসাত্মক মোড়—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
