আজকাল উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন সব বয়সের মানুষের মধ্যেই ক্রমশ সাধারণ সমস্যা হয়ে উঠছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-র রিপোর্ট অনুযায়ী, সারা বিশ্বে ৩০ থেকে ৭৯ বছর বয়সি প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। আশঙ্কার বিষয় হল, এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষই জানেন না যে তাঁদের এই সমস্যা রয়েছে। আর যাঁরা জানেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ নয়। ওষুধের পাশাপাশি সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা নিতে পারে। আর সেখানেই বড় ভূমিকা পালন করতে পারে বিটরুটের জুস।

একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বিটরুট জুস খেলে শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বাড়ে, রক্তনালিগুলি আরও নমনীয় হয় এবং এর ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। আসলে হৃদযন্ত্রের জন্য বিটরুটকে খুবই উপকারী বলে মনে করা হয়। সঠিক পরিমাণে ও নিয়মিত বিটরুট জুস পান করলে এটি রক্তনালিকে শিথিল করে, রক্তসঞ্চালন ভাল করে এবং ধীরে ধীরে রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।

কেন বিটরুট জুস উপকারী?

বিটরুট পুষ্টিগুণে ভরপুর। এতে রয়েছে ইলেক্ট্রোলাইট, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং নানা ধরনের উপকারী যৌগ, যা হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের জন্য ভাল।

ডায়েটিশিয়ান নেহা শির্কে জানিয়েছেন, বিটরুট জুসে থাকা নাইট্রেট শরীরে গিয়ে নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত হয়। এই নাইট্রিক অক্সাইড রক্তনালিকে প্রসারিত করে, ফলে রক্ত সহজে প্রবাহিত হয় এবং ধমনীর উপর চাপ কমে। এর ফলেই রক্তচাপ কমতে শুরু করে। গবেষণায়ও প্রমাণ মিলেছে, বিটরুট জুস নিয়মিত খেলে নাইট্রিক অক্সাইডের মাত্রা বাড়ে, রক্তনালি আরও নমনীয় হয় এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

গবেষণা কী বলছে?

বিজ্ঞানীদের মতে, হাইপারটেনশনে ভোগা মানুষের জন্য বিটরুট জুস বেশ উপকারী। ২০১৭ সালের একটি মেটা-অ্যানালিসিসে দেখা গিয়েছে, নিয়মিত বিটরুট জুস পান করলে সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক—দুই ধরনের রক্তচাপই কমে। গড়ে সিস্টোলিক রক্তচাপ প্রায় ৩.৫৫ এমএম এইচজি এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ প্রায় ১.৩২ এমএম এইচজি পর্যন্ত কমতে পারে। সংখ্যাগুলি ছোট মনে হলেও, এর ফলে স্ট্রোক, হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপজনিত অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

দিনে কতটা বিটরুট জুস খাবেন?

সকলের জন্য একটিই নির্দিষ্ট মাত্রা নেই। বিভিন্ন গবেষণায় দিনে ৭০ এমএল, ১৪০ এমএল এবং ২৫০ এমএল বিটরুট জুস খাওয়ার প্রভাব দেখা হয়েছে। সব ক্ষেত্রেই রক্তচাপে উন্নতি লক্ষ্য করা গিয়েছে, তবে দিনে ২৫০ এমএল জুস খাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভাল ফল মিলেছে। নেহার মতে, বেশিরভাগ হাইপারটেনশন রোগীর জন্য দিনে প্রায় ২০০ এমএল বিটরুট জুস যথেষ্ট। নিয়মিত এই পরিমাণে পান করলে ধীরে ধীরে রক্তচাপ স্বাভাবিকের কাছাকাছি চলে আসে।

কত দ্রুত প্রভাব দেখা যায়?

বিটরুট জুসের প্রভাব তুলনামূলকভাবে দ্রুত দেখা যেতে পারে। নেহা জানান, জুস খাওয়ার তিন-চার ঘণ্টার মধ্যেই নাইট্রেট নাইট্রিক অক্সাইডে রূপান্তরিত হয় এবং রক্তচাপ কমতে শুরু করে।
‘হাইপারটেনশন’ জার্নালেও উল্লেখ করা হয়েছে, প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যেই রক্তচাপে প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদি উপকার পেতে হলে সুষম খাদ্য ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার সঙ্গে নিয়মিত বিটরুট জুস পান করা জরুরি।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার দিকেও নজর দিন

সাধারণত বিটরুট জুস নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া সকলের জন্য উপযুক্ত নয়। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ‘বিটুরিয়া’ দেখা যেতে পারে, অর্থাৎ প্রস্রাব বা মলের রং গোলাপি বা লালচে হয়ে যেতে পারে। এটি ক্ষতিকর নয় এবং জুস বন্ধ করলে স্বাভাবিক হয়ে যায়। আয়রনের ঘাটতি রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়।

খালি পেটে বিটরুট জুস খেলে কারও কারও পেট ফোলা, গ্যাস, পেটব্যথা বা ডায়রিয়ার সমস্যা হতে পারে। এছাড়া বিটরুটে অক্সালেটের পরিমাণ বেশি থাকায়, যাঁদের কিডনি স্টোনের সমস্যা আছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে। অতিরিক্ত সেবনে কিডনির উপর চাপও পড়তে পারে।

ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত করবেন কি?

যাঁরা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিটরুট জুস খেতে চান, তাঁদের পরিমাণের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। সুষম খাদ্যের সঙ্গে প্রতিদিন প্রায় ২০০ এমএল বিটরুট জুস পান করলে উপকার মিলতে পারে। তবে কোনও শারীরিক সমস্যা থাকলে বা নিয়মিত ওষুধ সেবন করলে, বিটরুট জুস শুরু করার আগে অবশ্যই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সঠিকভাবে ও পরিমিত মাত্রায় বিটরুট জুস খেলে এটি প্রাকৃতিকভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী হতে পারে।