আজকাল ওয়েবডেস্ক: একবিংশ শতাব্দী বেশ কিছু নতুন এবং পুরনো ভাইরাসজনিত রোগের সাক্ষী হচ্ছে। সেগুলির মধ্যে অন্যমত সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম করোনাভাইরাস (SARS-CoV), মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম করোনাভাইরাস (MERS-CoV), ইবোলা ভাইরাস (EBOV), এমপক্স ভাইরাস (MPXV), SARS-CoV-2 এবং নিপা ভাইরাস (NiV)। ভারতের কেরলে গত কয়েক বছর তাণ্ডব চালিয়েছে নিপা। সেই ভাইরাসে আক্রান্ত দুই স্বাস্থ্যকর্মীর সন্ধান মিলল এবার পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং জনস্বাস্থ্য বিষয়ক পদক্ষেপে রাজ্য সরকারকে সহায়তা করার জন্য জাতীয় মহামারি মোকাবিলা দল মোতায়েন করা হয়েছে। এরপরেই প্রশ্ন উঠছে কতটা বিপজ্জনক এই ভাইরাস। এর উপসর্গ কী? মোকাবিলা করার পন্থাও বা কী?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে ২০০১ সালে শিলিগুড়িতে এবং ২০০৭ সালে নদিয়াতে নিপা ভাইরাস আক্রান্তের হদিশ মিলেছিল। কেরলে প্রথম ধরা পড়ে ২০১৮ সালে কোঝিকোড়ে এবং মালপ্পুরমে। ওই বছর কেরলে প্রায় ২১ জনের মৃত্যু হয়েছিল বলে অনুমান। এরপর ২০১৯, ২০২১ এবং ২০২৩ সাল মিলিয়ে এই ভাইরাসের হানায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
হু জানিয়েছে, অন্যান্য বহু রোগের চেয়ে নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। প্রায় ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ। এটি প্রধানত ফলাহারি বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। তবে এটি শূকর এবং অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। এর জন্য কোনও ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার হয়নি এখনও পর্যন্ত। এশিয়ায়, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে এই ভাইরাসের উপদ্রব বেশি দেখা যায়।
কীভাবে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস
কোনও মানুষ বা প্রাণী নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত কোনও প্রাণীর শারীরিক তরল পদার্থের (রক্ত, মল, মূত্র বা লালা) সংস্পর্শে আসলে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সংক্রমিত প্রাণী দ্বারা দূষিত হয়েছে এমন খাবার খেলে বা নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত কোনও ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসলে বা তাঁদের সেবা করার সময় সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।

নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণগুলি কী কী
এই ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলির হল জ্বর, মাথাব্যথা, শ্বাসকষ্ট, কাশি এবং গলা ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, পেশী ব্যথা এবং তীব্র দুর্বলতা। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার চার থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত উপসর্গগুলি দেখা দিতে শুরু করে। প্রথমে জ্বর বা মাথাব্যথা হওয়া। পরে কাশি ও শ্বাসকষ্টের মতো শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা দেখা দেওয়া সাধারণ লক্ষণ। গুরুতর ক্ষেত্রে, একজন ব্যক্তির মস্তিষ্কের সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। যা প্রাণনাশের কারণ।
অন্যান্য গুরুতর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভ্রান্তি এবং দিকভ্রান্তি, অস্পষ্ট কথা বলা, খিঁচুনি, কোমা এবং প্রবল শ্বাসকষ্ট। যদিও গবেষকরা পুরোপুরি নিশ্চিত নন যে, কেন কিছু আক্রান্তের গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয় এবং অন্যদের হাল্কা উপসর্গ দেখা দেয়। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের বেশ কয়েকজনের কোনও উপসর্গই থাকে না।
নিপাহ ভাইরাস কতটা সংক্রামক
নিপাহ ভাইরাস একটি ছোঁয়াচে রোগ। এটি লালা, মল, মূত্র এবং রক্তের মতো শারীরিক তরল পদার্থের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। ভাইরাসটি সাধারণত প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। তবে এটি মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে। ভাইরাসটি শ্বাসতন্ত্রের নিঃসৃত কণার মাধ্যমে ছড়ায়। অর্থাৎ, কোনও ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রোগ নির্ণয় কীভাবে
নাক বা গলার সোয়াব, সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (সিএসএফ), মূত্রের নমুনা, রক্তের নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।
রোগের উপশম
এর চিকিৎসার জন্য কোনও ওষুধ বা টিকা নেই। নিপাহ ভাইরাসের চিকিৎসার একমাত্র উপায় হল উপসর্গগুলি নিয়ন্ত্রণ করা। ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং জীবাণুমুক্ত করার মতো সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। পাশাপাশি অসুস্থ প্রাণী বা যেখানে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, সেই সব এলাকা এড়িয়ে চলতে হয়।
উপসর্গ দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ মতো প্রচুর পরিমাণে জল পান করা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া।, প্যারাসিটামল বা আইবুপ্রোফেন গ্রহণ করা, বমি বমি ভাব বা বমি নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ ব্যবহার করা, শ্বাসকষ্ট কমানোর জন্য ইনহেলার বা নেবুলাইজার ব্যবহার করা, খিঁচুনি হলে খিঁচুনি-রোধী ওষুধ গ্রহণ করা। গবেষকরা নিপা ভাইরাসের জন্য মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডি চিকিৎসার ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করছেন।
ভাইরাসটির প্রথম খোঁজ মেলে ১৯৯৯ সালে। মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে এর কারণে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এই ভাইরাসের কারণে দু’টি দেশে ১০ লক্ষেরও বেশি শূকর মেরে ফেলা হয়েছিল। যার ফলে দেশগুলির অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৯৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ২০টি প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছে।
বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর বা ভারতের মতো দেশে এই রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়াও, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ডের মতো অন্যান্য এলাকাও এই ভাইরাসের ঝুঁকিতে থাকতে পারে। কারণ নিপাহ ভাইরাস ছড়ানো বাদুড়ের প্রজাতিগুলি এই অঞ্চলগুলিতেই পাওয়া যায়।
