আজকাল ওয়েবডেস্ক: স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট এখন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পড়াশোনা, কাজ, বিনোদন—সবই এক ক্লিক দূরে। কিন্তু এই সহজলভ্য প্রযুক্তির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক বিপজ্জনক ফাঁদ—অনলাইন গেমিং আসক্তি। উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে দুই কিশোরী বোনের মর্মান্তিক মৃত্যু সেই অন্ধকার দিকটাকেই নতুন করে সামনে এনে দিল।
পরিবার সূত্রে খর ছিল, দুই বোনই দীর্ঘ সময় ধরে অনলাইন গেম খেলত। ধীরে ধীরে পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম—সব কিছুতেই প্রভাব পড়তে শুরু করে। তারা বাস্তব জগত থেকে দূরে সরে গিয়ে ভার্চুয়াল দুনিয়াতেই যেন ডুবে যাচ্ছিল। পরিবার বহুবার বোঝানোর চেষ্টা করলেও, গেমের প্রতি তাদের নির্ভরতা কমেনি। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয়, যা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি—দুই কিশোরীর মৃত্যু পুরো পরিবার ও সমাজকে স্তম্ভিত করে দেয়।
মনোবিদরা বলছেন, অনলাইন গেমিং শুধু বিনোদন নয়, অনেক ক্ষেত্রেই তা মস্তিষ্কে ডোপামিনের মাত্রা বাড়িয়ে এক ধরনের ‘নেশা’ তৈরি করে। প্রতিটি জয়, প্রতিটি লেভেল আপ বা রিওয়ার্ড খেলোয়াড়কে আরও বেশি সময় ধরে গেমে আটকে রাখে। ধীরে ধীরে তা মাদকাসক্তির মতোই আচরণগত আসক্তিতে পরিণত হয়। ফলে বাস্তব জীবনের চাপ, দায়িত্ব বা সমস্যার থেকে পালাতে গেমই হয়ে ওঠে একমাত্র আশ্রয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর-কিশোরীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে। কারণ এই বয়সে মানসিক পরিপক্বতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। বন্ধুবান্ধবের অভাব, একাকীত্ব, পড়াশোনার চাপ বা পারিবারিক সমস্যার কারণে তারা সহজেই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সেখানে তারা নিজেকে ‘হিরো’ বা ‘উইনার’ হিসেবে দেখতে পায়, যা বাস্তব জীবনে সব সময় সম্ভব হয় না।
গাজিয়াবাদের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের সবার জন্য সতর্কবার্তা। বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানদের স্ক্রিন টাইমের ওপর নজর রাখা, তাদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা এবং বাস্তব জীবনের খেলাধুলা, শখ ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া। একই সঙ্গে স্কুল ও সমাজকেও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও সচেতন হতে হবে।
অনলাইন গেম সম্পূর্ণ খারাপ নয়—সীমিত সময়ে তা বিনোদন ও দক্ষতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। কিন্তু যখন তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে নীরব শত্রু।
গাজিয়াবাদের দুই বোনের অকাল মৃত্যু আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল—ডিজিটাল দুনিয়ার আনন্দের আড়ালে কতটা গভীর অন্ধকার লুকিয়ে থাকতে পারে। এখনই সময় সচেতন হওয়ার, যাতে আর কোনও পরিবারকে এমন মর্মান্তিক মূল্য না দিতে হয়।
