আজকাল ওয়েবডেস্ক: বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এবং সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ নদী ব-দ্বীপ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপ ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে এই নীরব পরিবর্তনটি প্রায় ২৩ কোটি মানুষকে একটি মানবিক ও জলবায়ু বিপর্যয়ের আরও কাছাকাছি ঠেলে দিতে পারে। নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অনেক বড় নদীর এই ব-দ্বীপ এমন হারে ডুবে যাচ্ছে বা নীচে বসে যাচ্ছে, যা বিশ্বের সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হারের সমান বা তার চেয়েও বেশি।

গবেষণায় দেখা গিয়েছে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপ ভূমি ডুবে যাওয়ার নেপথ্যে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং তীব্র মনুষ্য কার্যকলাপের সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে। ব-দ্বীপগুলি হাজার হাজার বছর ধরে নদী দ্বারা বাহিত নরম পলি জমা হয়ে গঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পলি প্রাকৃতিকভাবে সংকুচিত হয় এবং নীচে বসে যায়। কিন্তু মানুষের কার্যকলাপ এখন এই প্রক্রিয়াটিকে ত্বরান্বিত করছে।

পানীয় জল ও সেচের জন্য অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের ফলে মাটির নীচের স্তরগুলি সংকুচিত হচ্ছে। যার কারণে উপরের মাটির স্তর বসে যাচ্ছে। দ্রুত নগরায়ন, ভারী পরিকাঠামো এবং ভঙ্গুর বাঁধ ব-দ্বীপ পৃষ্ঠের উপর আরও চাপ সৃষ্টি করে। একই সময়ে, স্রোতের প্রতিকূলে নির্মিত বাঁধ এবং নদী প্রকল্পগুলি পলিপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। যা অন্যথায় ব-দ্বীপকে ভরাট করতে এবং এর উচ্চতা বাড়াতে সাহায্য করত।

পরিস্থিতিকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক করে তুলেছে এই বিষয়টি যে, ব-দ্বীপের বেশ কিছু অংশে ভূমি অবনমন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সমান বা তার চেয়েও দ্রুত গতিতে ঘটছে। এর অর্থ হল, ওই সব অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কাছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এমন গতিতে বাড়ছে যা কেবল জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী হওয়ার কথা নয়। এর ফলে ঘন ঘন বন্যা, ঘূর্ণিঝড়ের সময় শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস, দ্রুত উপকূলীয় ভাঙন এবং কৃষিজমি ও মিষ্টি জলের উৎসে লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ বাড়ছে। যা খাদ্য নিরাপত্তা ও পানীয় জলের জন্য গুরুতর হুমকি।

গবেষণাটিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে ব-দ্বীপটি সমানভাবে ডুবে যাচ্ছে না। কিছু এলাকা এখনও নদী থেকে যথেষ্ট পলি পায়, যার ফলে সেগুলি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। তবে, জনবহুল অঞ্চল এবং ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত ভূখণ্ডগুলি অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই অসম ভাবে ডুবে যাওয়ার কারণে অত্যন্ত স্থানীয় দুর্যোগের ঝুঁকিও মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই ব-দ্বীপে প্রায় ২৩ কোটি মানুষের বাস। জলবায়ু এবং ভূমি ব্যবহারের সম্মিলিত চাপের কারণে পৃথিবীর অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল এটি। ভূমির উচ্চতার সামান্য পরিবর্তনের কারণে বিশাল জনগোষ্ঠী বন্যার কবলে পড়তে পারেন, অনেক গৃহহীন এবং জীবিকা হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, ব-দ্বীপটি রাতারাতি ‘হারিয়ে যাচ্ছে না’। কিন্তু টেকসই ভূগর্ভস্থ জলের ব্যবহার, উন্নত নগর পরিকল্পনা এবং প্রাকৃতিক পলিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারের মতো জরুরি পদক্ষেপ না নিলে, এটি একটি ভয়াবহ সঙ্কটে পরিণত হতে পারে।